যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উৎসবে খরা, তেহরানে বিশ্বনেতাদের ঢল
ইতিহাসের পাতায় কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির শোক কেবল একটি দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; তা পরিণত হয় একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও মানবিক ঘটনার প্রতীকে। শুক্রবার ইরানের রাজধানী তেহরান প্রত্যক্ষ করল তেমনই এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানকে ঘিরে রাজধানীর গ্র্যান্ড ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা লাখো মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ স্পিকার, মন্ত্রী, ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা সমবেত হন এই শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে।
জাতীয় শোকের এই আয়োজন কার্যত কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের মাটিতে অনুষ্ঠিত অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমাবেশে পরিণত হয়।
বিশ্বনেতাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং ৩০টিরও বেশি দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই স্মরণসভায় অংশ নিয়েছেন।
এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্ট স্পিকার, মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল।
তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, তুর্কমেনিস্তানের জাতীয় নেতা গুরবানগুলি বেরদিমুহামেদভ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ প্রতিনিধি দিমিত্রি মেদভেদেভও তেহরানে আসেন। ইরাক, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, লেবানন, ইয়েমেন, ভারত, চীন, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বহু দেশের প্রতিনিধিদল অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। একইসঙ্গে ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও আমাল আন্দোলন ও ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের শীর্ষ প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
আফ্রিকা থেকে মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, বুরকিনা ফাসো, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, নামিবিয়া, তানজানিয়া, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া ও সেনেগালের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা থেকেও বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা, ডি-৮ এবং ইকোনমিক কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এত বিপুলসংখ্যক রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধির উপস্থিতি শুধু শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটিকে ইরানের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং বহু দেশের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খামেনি সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের মূল্যায়ন
বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে তিনটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে– ইরানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরোধের রাজনীতি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাকে ‘একজন মহান আলেম’ এবং ‘একজন মহান নেতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, শহীদ খামেনির দৃঢ়তা, সাহস, ধৈর্য ও দূরদর্শিতা কঠিন সময়ে ইরানকে পথ দেখিয়েছে। তিনি অবিচল নিষ্ঠা ও অঙ্গীকারের সঙ্গে জাতির সেবা করেছেন।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ শহীদ ইমাম খামেনির শিক্ষা ও আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ‘শহীদ ইমাম খামেনি আমাদের জন্য এমন এক মহান শিক্ষা রেখে গেছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে এবং ন্যায়, ধৈর্য ও আদর্শের পথে চলার প্রেরণা জোগাবে।’
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ শহীদ খামেনি সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি কেবল ইরানের নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের নেতা। তার রেখে যাওয়া অবদান এটাই যে, সারা বিশ্বের মুসলমানরা তাকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি পুরো বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে একজন নায়ক।’
বেলারুশের হাউজ স্পিকার ইগোর সের্গিয়েঙ্কো আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রশংসা করে বলেন, তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন যিনি তার দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উৎসবে খরা, তেহরানে বিশ্বনেতাদের ঢল
সীমানা ছাড়িয়ে এক উত্তরাধিকার
অনেক সফরকারী কর্মকর্তা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে এমন এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন যার প্রভাব ইরানের বাইরেও পৌঁছেছিল। সমবেদনা বার্তায় বারবার আঞ্চলিক প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর প্রতি তার সমর্থন, জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে তার অবস্থান এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় প্রত্যাখ্যানের কথা উল্লেখ করা হয়।
উপস্থিত অনেক শোকাহত মানুষের কাছে এই ক্ষতি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। অন্যদিকে, সফরকারী নেতাদের জন্য এটি ছিল এমন একজন রাষ্ট্রনায়কের চলে যাওয়াকে স্বীকার করার মুহূর্ত, যার সিদ্ধান্ত এবং বাণী চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক রূপ দিয়েছিল।
তবুও তেহরানের এই বিশাল জনসমুদ্র যেন একটি ভিন্ন বার্তা দিতে বদ্ধপরিকর ছিল– কিছু উত্তরাধিকার কবরে হারিয়ে যায় না, বরং যারা তাদের মনে রাখেন, তারাই একে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আফগান নেতা আহমাদ শাহ মাসউদের ছেলে আহমাদ মাসউদ বলেন, ‘তিনি জান্নাতের যোগ্য একটি জীবন কাটিয়েছেন এবং তিনি জান্নাতবাসী একজন শহীদ হিসেবে এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন।’
ঐক্যবদ্ধ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব
বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পাশাপাশি ইরানের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বও এই শোকের মুহূর্তে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মহসেনী-এজেইসহ সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররা সাধারণ ইরানিদের সঙ্গে মোসাল্লায় অবস্থান করছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বার্তায় লিখেছেন, ‘আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে এবং এই রক্তঋণের চিৎকার বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বিশ্ব জানুক, ইরান দমে যাওয়ার পাত্র নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে তেহরানের নীরব বার্তা
এই বিদায় অনুষ্ঠানের সময়কাল বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের কাছেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও স্বাধীনতা দিবস। দিনটিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নানা আয়োজন থাকলেও তীব্র দাবদাহের কারণে ওয়াশিংটন, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড ও কলোরাডোসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একাধিক অনুষ্ঠান বাতিল বা সীমিত করতে হয়েছে। বাতিল হওয়া উল্লেখযোগ্য আয়োজনগুলোর মধ্যে ছিল ফিলাডেলফিয়ার ‘স্যালুট টু ইন্ডিপেন্ডেন্স সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল প্যারেড’, যা ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলোর একটি। প্যারেডের আয়োজক সংস্থা ‘ওয়াওয়া ওয়েলকাম আমেরিকা’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ডেলবেনে বলেন, বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের মধ্যে এত বড় আয়োজন পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ইরানে। তেহরানেও প্রচণ্ড গরম থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে বিদেশি কূটনীতিকদের অংশগ্রহণ ছিল নজিরবিহীন। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিপক্ষের বিদায় অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতাদের এই সমাগমকে বিশ্লেষকরা দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে। মার্কিন একতরফাবাদ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার নীতি যে ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি, তীব্র গরমের মাঝেও ৯০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদের এই উপস্থিতি তারই প্রমাণ। ৩০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সমাগম ঘটিয়ে ইরান দেখিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের ‘আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নকরণ’ নীতি সফল হয়নি। নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক চাপের মুখেও চীন, রাশিয়া, বেলারুশ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এই স্তরের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে ইরানের একচ্ছত্র কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
যে দিনটিতে যুক্তরাষ্ট্র তার আড়াইশ বছরের শক্তি ও স্বাধীনতা উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই দিনেই প্রচণ্ড গরম সত্ত্বেও তেহরানের রাস্তায় লাখ লাখ মানুষের ঢল এবং বিদেশি কূটনীতিকদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়ে নেয়। একদিকে তীব্র গরমে যুক্তরাষ্ট্রের বহু অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া, অন্যদিকে একই গরমে ইরানি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সংহতি– এই তুলনামূলক চিত্রটিকে ইরান তার আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে তেহরান বার্তা দিয়েছে যে, তাদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ শুধু সামরিকভাবে নয়, কূটনৈতিক ও সামাজিকভাবেও অটল।
ইরাক, কুর্দিস্তান ও লেবাননের মতো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অংশীদারদের এই অনুষ্ঠানে উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি এটিই ইঙ্গিত করে যে, ওয়াশিংটনের প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক শক্তিগুলো তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে নারাজ। মার্কিন একতরফাবাদের বিপরীতে একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার যে উত্থান ঘটছে, খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানকে শতাব্দীর অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সমাবেশে রূপ দিয়ে ইরান সেই নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই জানান দিল।
ফার্সিতে একটি প্রবাদ আছে: ‘মহৎ ব্যক্তিরা কখনোই সত্যি সত্যি মারা যান না। তারা সময়ের মাঝে বেঁচে থাকেন এবং তাদের ভাবনার স্রোত ইতিহাসের হৃদয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।’ অনেকের কাছে আয়াতুল্লাহ খামেনি ছিলেন সেই প্রবাদেরই মূর্ত প্রতীক। তার সমর্থকদের কাছে সেই স্মৃতি কেবল বক্তৃতা ও নীতিমালায় লেখা ছিল না, বরং তা লেখা হয়েছিল তেহরানের দিকে ধাবিত হওয়া লাখ লাখ মানুষের পদচিহ্নে।
জনসমুদ্র তেহরান
বিদেশি অতিথিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের একদিন পর, আজ শনিবারের প্রথম প্রহর থেকেই তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সের ভেতর ও বাইরে মানুষের সমাগম শুরু হয়। ভোর থেকেই অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনের বাইরে জড়ো হয়ে দ্রুতগতির গণপরিবহন চালু হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকেন। ভোরবেলায় অনেক মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ থাকলেও কালো পোশাক পরা শোকাহত মানুষের দীর্ঘ সারি সেখানে অপেক্ষা করছিল। স্টেশন খোলার পর বিপুল এই জনস্রোত মোসাল্লার দিকে ধাবিত হয়। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি পুরো তেহরানে এক নজিরবিহীন আবেগঘন দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে।
পরিবারগুলো ফুল, কোরআন ও শহীদ নেতার প্রতিকৃতি নিয়ে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রবেশ করতে থাকে। বৃদ্ধরা এমন সব শিশুদের পাশে নিয়ে হাঁটছিলেন, যাদের বয়স আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বের সূচনা মনে রাখার মতো নয়, তবে এর শেষ অধ্যায়ের সাক্ষী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এই শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বেশি কিছুতে পরিণত হয়েছিল। এটি ছিল শোকাচ্ছন্ন একটি জাতির প্রতিচ্ছবি, আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক মিলনমেলা এবং একটি অনুস্মারক যে– একজন নেতার মূল্যায়ন কেবল তার নেতৃত্বের বছরগুলো দিয়ে হয় না, বরং তার চলে যাওয়ার পর যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।
এই দিনে তেহরান বিশ্বের সাথে কথা বলেছিল– কোনো বক্তৃতা বা ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের পদধ্বনি, অসংখ্য প্রার্থনা এবং বিদায়ের এক গম্ভীর মর্যাদার মাধ্যমে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের আকস্মিক বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি তার কার্যালয়ে বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ শহীদ হন। তার শাহাদাতের ১২৫ দিন পর তেহরানের এই শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বেশি কিছুতে পরিণত হয়েছে। এটি ছিল শোকাচ্ছন্ন একটি জাতির প্রতিচ্ছবি, যা প্রমাণ করে– একজন নেতার মূল্যায়ন কেবল তার নেতৃত্বের সময়কাল দিয়ে হয় না, বরং তার চলে যাওয়ার পর যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে তার আসল বৈশ্বিক প্রভাব।